ভূমিকা
শিক্ষাবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে শিখন বা Learning একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। মানুষ বা যেকোনো প্রাণী কীভাবে শেখে, তা ব্যাখ্যা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে মনোবিজ্ঞানীরা নানাবিধ তত্ত্ব প্রদান করেছেন। এদের মধ্যে রাশিয়ার শারীরবিদ ইভান পভলভ (Ivan Pavlov) এবং মার্কিন মনোবিজ্ঞানী বি. এফ. স্কিনার (B. F. Skinner) এর শিখন তত্ত্ব দুটি সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। এই ব্লগে আমরা পভলভের ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং (Classical Conditioning) এবং স্কিনারের অপারেন্ট কন্ডিশনিং (Operant Conditioning) তত্ত্বের বিস্তারিত আলোচনা এবং শ্রেণিকক্ষে এদের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব।
১. ইভান পভলভের ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং (প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্ব)
১৯০৪ সালে নোবেলজয়ী শারীরবিদ ইভান পভলভ কুকুরের লালা নিঃসরণ প্রক্রিয়া পরীক্ষা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত এই তত্ত্বটি আবিষ্কার করেন। একে বাংলায় 'প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্ব' বলা হয়।
পভলভের পরীক্ষা:
পভলভ একটি ক্ষুধার্ত কুকুরকে নিয়ে পরীক্ষাটি করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, কুকুরের সামনে খাবার (স্বাভাবিক উদ্দীপক) আনলে তার মুখ থেকে লালা নিঃসৃত (স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া) হয়। এরপর তিনি খাবার দেওয়ার ঠিক আগে একটি ঘণ্টা বাজানো শুরু করলেন। কয়েকবার এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তির পর দেখা গেল, খাবার ছাড়াই শুধুমাত্র ঘণ্টার আওয়াজ শুনেই কুকুরের মুখ থেকে লালা নিঃসৃত হচ্ছে। অর্থাৎ, ঘণ্টার শব্দের সাথে লালা নিঃসরণের একটি কৃত্রিম সংযোগ বা অনুবর্তন তৈরি হয়েছে।
তত্ত্বের মূল উপাদানসমূহ:
- Unconditioned Stimulus (UCS): স্বাভাবিক উদ্দীপক (যেমন: খাদ্য)।
- Unconditioned Response (UCR): স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া (যেমন: লালা নিঃসরণ)।
- Conditioned Stimulus (CS): কৃত্রিম বা অনুবর্তিত উদ্দীপক (যেমন: ঘণ্টার আওয়াজ)।
- Conditioned Response (CR): অনুবর্তিত প্রতিক্রিয়া (যেমন: ঘণ্টার আওয়াজ শুনে লালা নিঃসরণ)।
২. বি. এফ. স্কিনারের অপারেন্ট কন্ডিশনিং (সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব)
আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী বি. এফ. স্কিনার ১৯৩৮ সালে এই তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। একে বাংলায় 'সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব' বলা হয়। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো—প্রাণীর আচরণ তার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে।
স্কিনারের পরীক্ষা:
স্কিনার একটি ক্ষুধার্ত ইঁদুরকে একটি বিশেষ বাক্সে (Skinner Box) রাখেন। বাক্সের ভেতরে একটি লিভার ছিল। ইঁদুরটি বাক্সের ভেতরে ঘোরাঘুরি করার সময় হঠাৎ লিভারে চাপ দেয় এবং সাথে সাথে একটি খাবারের টুকরো এসে পড়ে। পরবর্তীতে ইঁদুরটি বুঝতে পারে যে লিভারে চাপ দিলে খাবার পাওয়া যায়। ফলে সে তার ক্ষুধা মেটানোর জন্য বারবার লিভারে চাপ দিতে শুরু করে। এখানে ইঁদুরটির আচরণ সক্রিয় ছিল।
তত্ত্বের মূল উপাদানসমূহ:
- Reinforcement (পুনর্বলন বা পুরস্কার): যে উদ্দীপক কোনো আচরণকে বারবার করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। এটি দুই প্রকার:
- Positive Reinforcement: ভালো কাজের জন্য পুরস্কার বা প্রশংসা করা।
- Negative Reinforcement: কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দেওয়া (যেমন: পরীক্ষার ভয় দূর করা)।
- Punishment (শাস্তি): যে উদ্দীপক কোনো অবাঞ্ছিত আচরণকে কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে।
৩. ক্লাসিক্যাল ও অপারেন্ট কন্ডিশনিংয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং (পভলভ) | অপারেন্ট কন্ডিশনিং (স্কিনার) |
|---|---|---|
| আচরণের প্রকৃতি | অনিচ্ছাকৃত বা স্বতঃস্ফূর্ত (Involuntary) | ঐচ্ছিক বা সক্রিয় (Voluntary) |
| উদ্দীপকের ভূমিকা | উদ্দীপক প্রতিক্রিয়ার আগে আসে (S-R) | প্রতিক্রিয়ার পর উদ্দীপক বা ফলাফল আসে (R-S) |
| শিক্ষার্থীর ভূমিকা | শিক্ষার্থী নিষ্ক্রিয় থাকে | শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে |
৪. শ্রেণিকক্ষে এই তত্ত্বগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগ
শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এই দুটি তত্ত্বের ভূমিকা অপরিসীম। একজন শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে আপনি কীভাবে এগুলো প্রয়োগ করতে পারেন তা নিচে আলোচনা করা হলো:
ক) ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিংয়ের প্রয়োগ:
- ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি: বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং শিক্ষকের আচরণ যদি আনন্দদায়ক হয়, তবে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব (Conditioned Response) গড়ে তুলবে।
- ভীতি দূরীকরণ: অনেক শিক্ষার্থীর গণিত বা ইংরেজি বিষয়ের প্রতি ভয় থাকে। শিক্ষক যদি সহজ ও খেলার ছলে এই বিষয়গুলো শেখান, তবে বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের ভয় দূর হবে।
- সুঅভ্যাস গঠন: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে প্রার্থনা, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা তৈরি করা যায়।
খ) অপারেন্ট কন্ডিশনিংয়ের প্রয়োগ:
- প্রশংসা ও পুরস্কার (Positive Reinforcement): শ্রেণিকক্ষে কোনো শিক্ষার্থী সঠিক উত্তর দিলে তাকে 'খুব ভালো', 'ধন্যবাদ' বলা বা হাততালি দেওয়ার মাধ্যমে তার শেখার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া যায়।
- টোকেন ইকোনমি (Token Economy): ভালো আচরণের জন্য শিক্ষার্থীদের স্টার (Star) বা পয়েন্ট দেওয়া যেতে পারে, যা পরবর্তীতে কোনো পুরস্কারের সাথে বিনিময় করা যাবে।
- নেতিবাচক আচরণ সংশোধন: কোনো শিক্ষার্থী যদি ক্লাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তবে তাকে সাময়িকভাবে কোনো বিশেষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে (যেমন: খেলার পিরিয়ডে অংশ নিতে না দেওয়া) তার আচরণ সংশোধন করা যায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, পভলভের ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং যেমন শিক্ষার্থীদের আবেগীয় আচরণ ও সুঅভ্যাস গঠনে সাহায্য করে, তেমনি স্কিনারের অপারেন্ট কন্ডিশনিং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আচরণ পরিবর্তনে দারুণ ভূমিকা পালন করে। একজন দক্ষ শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে এই দুটি তত্ত্বের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াকে আরও ফলপ্রসূ ও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব।
