গেস্টাল্ট মতবাদ ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন তত্ত্ব (Insight Learning)
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে শিখন (Learning) প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করার জন্য বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। এর মধ্যে 'গেস্টাল্ট মতবাদ' এবং উল্ফগ্যাং কোহলারের (Wolfgang Köhler) 'অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন তত্ত্ব' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্বে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে সমগ্ৰতার ভিত্তিতে উপলব্ধি এবং হঠাৎ বুদ্ধিদীপ্ত সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
গেস্টাল্ট মতবাদ কী?
'গেস্টাল্ট' (Gestalt) একটি জার্মান শব্দ, যার অর্থ 'সমগ্রতা' (Configuration or Whole) বা 'অবয়ব'। ১৯২০-এর দশকে ম্যাক্স ওয়ার্থাইমার, কার্ট কোফকা এবং উল্ফগ্যাং কোহলার এই মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন। তাদের মূল বক্তব্য ছিল—"সমগ্র অংশগুলির সমষ্টির চেয়ে বেশি এবং আলাদা"। অর্থাৎ, আমরা কোনো বস্তু বা পরিস্থিতিকে খণ্ড খণ্ডভাবে দেখি না, বরং একটি সম্পূর্ণ রূপ বা প্যাটার্ন হিসেবে উপলব্ধি করি।
কোহলারের অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন পরীক্ষা (Insight Learning Experiment)
অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন বা ইনসাইট লার্নিং (Insight Learning) বোঝাতে বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী উল্ফগ্যাং কোহলার শিম্পাঞ্জির ওপর বেশ কিছু পরীক্ষা চালান। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত পরীক্ষাটি ছিল 'সুলতান' নামের একটি ক্ষুধার্ত শিম্পাঞ্জিকে নিয়ে।
পরীক্ষার বিবরণ:
- পরীক্ষাগারে সুলতান নামক শিম্পাঞ্জিটিকে একটি খাঁচায় বন্দী রাখা হয় এবং খাঁচার ঠিক বাইরে একটি কলা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যা তার হাতের নাগালের বাইরে ছিল।
- খাঁচার ভেতরে কয়েকটি ছোট লাঠি রাখা হয়, যেগুলো একে অপরের সাথে যুক্ত করা যেত।
- প্রথমে সুলতান হাত বাড়িয়ে বা একটি লাঠি দিয়ে কলাটি পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
- হতাশ হয়ে সে যখন বসে পড়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, তখন হঠাৎ তার মাথায় বুদ্ধি আসে (Insight)। সে দুটি ছোট লাঠিকে জোড়া লাগিয়ে একটি লম্বা লাঠি তৈরি করে এবং তা দিয়ে কলাটি টেনে এনে খায়।
দ্বিতীয় আরেকটি পরীক্ষায়, কলাটি ছাদের সাথে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং খাঁচার নিচে কয়েকটি বাক্স রাখা হয়। শিম্পাঞ্জিটি বুদ্ধি খাটিয়ে বাক্সগুলোকে একটার ওপর একটা সাজিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে কলাটি পেরে নেয়।
অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের বৈশিষ্ট্য
কোহলারের এই পরীক্ষা থেকে অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
- হঠাৎ উদয় (Suddenness): এই শিখনে কোনো দীর্ঘ প্রচেষ্টা বা ভুল-চেষ্টার (Trial and Error) প্রয়োজন হয় না। হঠাৎ করেই সমস্যার সমাধান মাথায় আসে।
- সমগ্র পরিস্থিতির উপলব্ধি: প্রাণীটি বিচ্ছিন্নভাবে সমস্যা না দেখে সম্পূর্ণ পরিস্থিতিকে এক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে।
- স্থায়িত্ব: অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে অর্জিত শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না।
- বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ: এটি কেবল যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার পরিচায়ক।
শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্তর্দৃষ্টিমূলক তত্ত্বের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কোহলারের এই তত্ত্বের প্রভাব অপরিসীম:
- মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বোধগম্যতা: এই তত্ত্ব শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার পরিবর্তে কোনো বিষয় গভীরভাবে বুঝতে ও আত্মস্থ করতে উৎসাহিত করে।
- সমস্যা সমাধান ক্ষমতা বিকাশ: গণিত বা বিজ্ঞান বিষয়ের জটিল সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীরা খণ্ড খণ্ড ধারণাকে একত্রিত করে সামগ্রিক সমাধান বের করতে শেখে।
- পাঠ্যক্রম প্রণয়ন: পাঠ্যপুস্তক এমনভাবে তৈরি করা উচিত যাতে শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্ন তথ্য না পেয়ে সমগ্র বিষয়ের একটি স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারে।
- সৃজনশীলতা বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল চিন্তা এবং ইনসাইট বা অন্তর্দৃষ্টির বিকাশ ঘটানোর জন্য এই তত্ত্বের জুড়ি মেলা ভার।
উপসংহার
গেস্টাল্ট মতবাদ ও কোহলারের অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন তত্ত্ব শিক্ষা বিজ্ঞানকে এক নতুন দিশা দেখিয়েছে। শিখন কেবল উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার যান্ত্রিক সম্পর্ক নয়, বরং এটি হল মননশীলতা এবং সমগ্র পরিস্থিতি অনুধাবনের একটি প্রক্রিয়া। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্য প্রদান না করে, তাদের অন্তর্দৃষ্টি জাগিয়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
