ভূমিকা
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ড. দৌলত সিং কোঠারির সভাপতিত্বে গঠিত 'শিক্ষা কমিশন' বা কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬)-এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি ছিল ভারতের প্রথম সর্বাঙ্গীন শিক্ষা কমিশন, যা প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সমস্ত স্তরের ত্রুটি দূর করে একটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছিল। WBUTTEPA (BSAEU)-এর B.Ed প্রথম সেমিস্টারের Course 1.1.2 (Childhood and Growing Up / Contemporary India and Education) সিলেবাসের জন্য এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোঠারি কমিশনের (১৯৬৪-৬৬) প্রধান সুপারিশসমূহ
কোঠারি কমিশন তাদের প্রতিবেদনে শিক্ষাক্ষেত্রে বহু দূরদর্শী পরিবর্তনের প্রস্তাব পেশ করে। নিম্নে প্রধান সুপারিশগুলি আলোচনা করা হলো:
১. শিক্ষাক্রম ও কাঠামোর সংস্কার (The Common School System & Structure)
- কমিশন সারা দেশের জন্য একটি সুসংগত শিক্ষাকட்டামোর প্রস্তাব করে, যা সাধারণত ১০+২+৩ পদ্ধতি নামে পরিচিত (১০ বছরের সাধারণ শিক্ষা, ২ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক এবং ৩ বছরের স্নাতক কোর্স)।
- সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে 'কমন স্কুল সিস্টেম' বা অভিন্ন বিদ্যালয় ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়।
২. বৃত্তিমুখীকরণ (Vocationalization of Education)
- মাধ্যমিক স্তরকে কেবল উচ্চশিক্ষার সোপান হিসেবে না দেখে কর্মমুখী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
- কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে ২০% এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৫০% ছাত্রছাত্রীকে বৃত্তিমূলক শিক্ষার আওতায় আনার কথা বলা হয়।
৩. ত্রি-ভাষা সূত্র (Three-Language Formula)
- ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে কমিশন 'ত্রি-ভাষা সূত্র' প্রয়োগের সুপারিশ করে। মাতৃভাষার পাশাপাশি হিন্দি এবং একটি আধুনিক ভারতীয় ভাষা বা ইংরেজি শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৪. বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষা
- বিদ্যালয় স্তরে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষাকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়।
৫. শিক্ষক শিক্ষা ও মর্যাদা (Teacher Education & Status)
- শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলির আধুনিকীকরণের কথা বলা হয়।
- শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতনক্রম এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে কোঠারি কমিশনের গুরুত্ব ও শিক্ষাগত তাৎপর্য
ভারতের মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে কোঠারি কমিশনের সুপারিশগুলির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নিচে এর শিক্ষাগত তাৎপর্য পয়েন্ট আকারে দেওয়া হলো:
- জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি গঠন: এই কমিশন প্রথমবার বিচ্ছিন্ন শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি জাতীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে, যা দেশের সংহতি রক্ষায় সাহায্য করে।
- গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা: জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ (Equal Opportunities) বা 'কমন স্কুল সিস্টেম' চালুর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ভাবধারা সুদৃঢ় হয়।
- কর্মসংমুখী শিক্ষা: মাধ্যমিক স্তরে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রবর্তন বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে এবং শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কার: শুধু মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সার্বিক মূল্যায়ন (Comprehensive Evaluation) এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
- জাতীয় শিক্ষানীতি (1968): কোঠারি কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই ভারতের প্রথম জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হয়, যা পরবর্তীতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬) কেবল কিছু সুপারিশের সমষ্টি ছিল না, এটি ছিল ভারতের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ব্যবস্থার এক দূরদর্শী রূপরেখা। আধুনিক ভারতের শিক্ষা নীতি, শিক্ষণ পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মূলে রয়েছে এই কমিশনের বহু মূল্যবান অবদান। একজন ভাবী শিক্ষক হিসেবে B.Ed প্রশিক্ষণার্থীদের এই কমিশনের আদর্শ ও সুপারিশগুলি অনুধাবন করা একান্ত প্রয়োজন।

