Concept Attainment Model (ধারণা অর্জন মডেল)
ভূমিকা (Introduction)
Concept Attainment Model বা ধারণা অর্জন মডেল হলো শিক্ষাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি 'তথ্য প্রক্রিয়াকরণ মডেল' (Information Processing Model)। প্রখ্যাত জ্ঞানমূলক মনোবিদ জেরোম ব্রুনার (Jerome S. Bruner) এবং তাঁর সহযোগী জ্যাকুলিন গুডনাও (Jacqueline Goodnow) ও জর্জ অস্টিন (George Austin) ১৯৫৬ সালে তাঁদের "A Study of Thinking" গ্রন্থে এই মডেলটি উদ্ভাবন করেন।
এই মডেলের মূল ভিত্তি হলো—শিক্ষার্থীরা চারপাশের বিভিন্ন উদাহরণ (positive and negative examples) থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে, সেই তথ্যের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করবে এবং নিজস্ব চিন্তাশক্তির মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট 'ধারণা' (Concept) গঠন করবে। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে শিখন সম্পন্ন করাই এই মডেলের মূল উদ্দেশ্য।
১. Strategy (কৌশল)
শিক্ষার্থীরা কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং ধারণায় পৌঁছায়, তার জন্য মূলত চারটি কৌশল অবলম্বন করা হয়:
i) Simultaneous Scanning Strategy: এই কৌশলে ধারণার সঙ্গে স্মৃতি (memory) বিচার করে একসঙ্গে কাজ সম্পন্ন হয়। এতে Positive Example নেওয়া হয়।
ii) Successive Scanning Strategy: ধারণার মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যায়ক্রমে বিচার করা হয়।
iii) Conservative Focusing Strategy: প্রত্যেক ধাপে সতর্কভাবে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে ধারণা গঠন করা হয়।
iv) Focus Gambling Strategy: কোনো বিষয় উপস্থাপনের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর ফলাফল হয় 'stop' বা সমাপ্তি ধাপ।
২. Model-এর উপাদান (Factors)
ব্রুস জয়েস এবং মার্শা ওয়েল-এর মতানুসারে এই মডেলের প্রধান উপাদানগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
Focus (উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য):
i) যুক্তি, ধারণা, বুদ্ধি (Increased thought abilities): শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি ও যুক্তিগঠনের বিকাশ ঘটানো।
ii) সাধারণীকরণের ক্ষমতা (Understanding simple way): বিভিন্ন উদাহরণের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে বের করে সহজ উপায়ে সাধারণীকরণ বা Generalization করা।
iii) বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে ধারণা অর্জন (According to content basis concept achieved): নির্দিষ্ট পাঠ্য বা কনটেন্টের ওপর ভিত্তি করে সঠিক ধারণা লাভ করা।
৩. Syntax (ধাপসমূহ)
এই মডেলের পর্যায় বা ধাপগুলিকে তিনটি মূল ফেজে ভাগ করা যায়:
Phase – 1 : Presentation of Data and Identification of Concept (তথ্য উপস্থাপন ও ধারণা শনাক্তকরণ)
i) তথ্য উপস্থাপন (Presentation of Data): শিক্ষক সদর্থক (Positive) ও নঞর্থক (Negative) উদাহরণ তুলে ধরেন।
ii) বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণ (Identification of Concept): শিক্ষার্থীরা উদাহরণের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি খুঁজে বের করে।
iii) অনুমান (Hypothesis): শিক্ষার্থীরা একটি সম্ভাব্য ধারণায় বা অনুমানে পৌঁছায়।
iv) পরীক্ষা (Experiment): অনুমিত ধারণাটি সঠিক কি না, তা যাচাই করা হয়।
v) শিক্ষকের সাহায্য গ্রহণ (Teacher Help): প্রয়োজনে শিক্ষকের সহায়তা নেওয়া হয়।
vi) আলোচনা (Discussion / বিষয়ের আলোচনা): সম্পূর্ণ বিষয়টি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করা হয়।
Phase – 2 : Testing Attainment of the Concept (ধারণা লাভের পরীক্ষা)
i) সঠিকতা যাচাই: অর্জিত ধারণাগুলির সঠিকতা যাচাই করা হয়।
ii) বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণ: ধারণার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণ।
iii) প্রয়োগ: শিক্ষার্থীরা নতুন উদাহরণের ওপর তাদের অর্জিত ধারণার প্রয়োগ করে।
Phase – 3 : Analysis of Thinking Strategies (চিন্তা কৌশলের বিশ্লেষণ)
i) পদ্ধতির ব্যাখ্যা: এই চিন্তা কৌশলগুলি Phase–2-এর ভিত্তিতে চিন্তার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে।
ii) অনুমানের পরীক্ষা: Hypothesis বা অনুমানের পরীক্ষা করা হয়।
iii) মূল্যায়ন: শিক্ষার্থীদের চিন্তার ধরন ও মূল্যায়ন করা হয়।
৪. Principle of Reaction (প্রতিক্রিয়ার নীতি)
i) Hypothesis (অনুমান): এই পদ্ধতিতে শিক্ষক অর্জিত ও সঠিক বৈশিষ্ট্যগুলি উদাহরণের মাধ্যমে নির্দেশ করেন। শিক্ষক এখানে শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনাকে সঠিক দিশা দেখান এবং তাদের অনুমানগুলিকে সমর্থন বা সংশোধন করেন।
৫. Social System (সামাজিক ব্যবস্থা)
i) পারস্পরিক সহযোগিতা: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ক্রিয়াশীলতার ভিত্তিতে শিক্ষা প্রদান করা হয়। এখানে শিক্ষকের ভূমিকা হলো একজন সহায়ক, নির্দেশক এবং নিয়ন্ত্রকের। শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ থাকে অত্যন্ত গণতান্ত্রিক, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে।
৬. Support System (সহায়ক ব্যবস্থা)
i) শিক্ষাসামগ্রীর প্রয়োগ: শিক্ষার্থীর positive এবং negative—উভয় ধরনের Aids বা শিক্ষাসামগ্রীর প্রয়োগের মাধ্যমে ধারণা গঠনকে সহায়তা করা হয়। উদাহরণ: বইপত্র, বর্ণনা, বিশ্লেষণ, চার্ট, মডেল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক শিক্ষা উপকরণ (TLM)।
৭. শিক্ষাগত তাৎপর্য (Educational Implication)
B.Ed পাঠ্যক্রমে এই মডেলটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে:
বিশ্লেষণী ক্ষমতার বৃদ্ধি: এই মডেল শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার প্রবণতা কমায় এবং বিশ্লেষণ ও যুক্তি দিয়ে কোনো বিষয় বুঝতে সাহায্য করে।
সক্রিয় শিখন: শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা না থেকে নিজেরা উদাহরণ থেকে ধারণা তৈরি করে, ফলে শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন: অনুমান (Hypothesis) তৈরি এবং তা যাচাই করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মানসিকতার বিকাশ ঘটে।
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, জেরোম ব্রুনারের Concept Attainment Model গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি অত্যন্ত কার্যকরী বিকল্প। এটি কেবল কোনো বিষয়কে জানতেই সাহায্য করে না, বরং "কীভাবে শিখতে হয়" (How to learn) সেই কৌশলটিও শিক্ষার্থীদের আয়ত্ত করতে শেখায়। একজন দক্ষ শিক্ষকের সঠিক নির্দেশনায় এই মডেল শ্রেণিকক্ষের শিখন-শিখন প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও ফলপ্রসূ করে তুলতে পারে।
